logo-img

১০, ডিসেম্বর, ২০১৯, মঙ্গলবার | | ১২ রবিউস সানি ১৪৪১


‘বাবা মারা যাননি, উনি হেলিকপ্টারে বাড়ি আসবেন?’

রিপোর্টার: নিজস্ব প্রতিনিধি: | ২৬ নভেম্বর ২০১৯, ০১:২৯ পিএম


‘বাবা মারা যাননি, উনি হেলিকপ্টারে বাড়ি আসবেন?

হাসানের বয়স এখন ৩ বছর। সে এখন কথা বলতে শিখছে। কেউ যদি হাসানের কাছে বলে তোমার বাবা মারা গেছে? তখন হাসান বলে– ‘আমার বাবা মারা যায়নি। আমার আব্বু আছে, কখনও বলে ঢাকায় আছে, কখনও বলে বিদেশে আছে।’

বাড়ির ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে গেলে হাসান বলে, ‘ওই যে আমার আব্বু হেলিকপ্টারে করে বাড়ি আসছেন।’

সে জানে না তার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌকিদার চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর কখনও ফিরে আসবেন না।

সোমবার ছেলের এ কথাগুলো বলতে বলতে হাসানের মা সোনিয়া বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গির সঙ্গে নিহত পিজার শেফকুক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন।

মামলার রায়ে সাইফুল নির্দোষ এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করেন স্ত্রী সোনিয়া আক্তার। এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও চান তিনি।

তিনি জানান, সেলাইয়ের কাজ করে এবং আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় তাদের সংসার চলে। এ ছাড়া তাদের সন্তানদের পড়াশোনাও চলে স্বজনদের সহায়তায়।

সাইফুল ইসলাম চৌকিদার শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের দ্বিতীয় সন্তান। তিনি হলি আর্টিজানে পিজার কুক ছিলেন।

সরেজমিন নিহত সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী সোনিয়া বেগম শিশু ছেলে হাসানকে নিয়ে দরজার সামনে বসে আছেন। কথা হয় সোনিয়া বেগমের সঙ্গে; তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর তিন মাস পর জন্ম হয় ছেলে হাসানের। বাবা মারা গেছে শুনলেই সে বলে, আমার আব্বু মারা যায়নি। আমার আব্বু ঢাকায় আছে, আবার কখনও বলে– আমার আব্বু বিদেশে আছে। বাড়ির ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে গেলে বলে আমার আব্বু হেলিকপ্টারে আসবে। কখনও নতুন পোশাক কিনে দিলে বলে আব্বু পাঠাইছে।

স্ত্রী সোনিয়া আক্তার বলেন, আমার স্বামী নির্দোষ ছিল। মামলার রায়ে সাইফুল নির্দোষ এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে– এটি আমাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।

নিহত সাইফুলের মা সমেরা বেগমের কাছে সাইফুলে কথা জানতে চাইলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাই আমরা লাশটা ফেরত চেয়েছিলাম। কিন্তু লাশ আমাদের ফেরত দেয়নি। এত কিছু করার পরও লাশ যখন পাইনি, এখন আর কী আপনাদের বলব। আর লেখালেখি করে কী লাভ হবে?

২০১৬ সালের ১ জুলাই দিবাগত রাতে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গির সঙ্গে নড়িয়ার কলুকাঠি গ্রামের সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন।

মৃত্যুর মাত্র দেড় বছর আগে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় পিজা তৈরির কুক হিসেবে কাজে যোগদান দেন তিনি। নিহত হওয়ার পর থেকে কর্তব্যরত পুলিশ সাইফুলকে জঙ্গি দলের সদস্য বলে চিহ্নিত করে।

তদন্তকালে সাইফুলের মা সমেরা বেগমকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ছেলের লাশ শনাক্ত করতে এবং ডিএনএ টেস্ট করতে ঢাকায় নিয়ে যায়।

এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নড়িয়া থানা থেকেও সাইফুল সম্পর্কে ভালো লোক বলে প্রত্যয়ন দেয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘ তিন মাস তদন্ত করে অবশেষে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে বেওয়ারিশ লাশ বলে সাইফুলের মরদেহ নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে।

শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের সাইফুল ইসলাম চৌকিদার এ ঘটনায় সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তাদের দাবি– সাইফুল হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর একজন পিজার কুক ছিলেন।

গত দুদিন আগে টেলিভিশন নিউজে দেখা গেছে, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর সাক্ষী-প্রমাণ শেষে আগামী ২৭ নভেম্বর হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর জঙ্গি হামলা মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

এ মামলার রায়ে যেন প্রকৃত দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। এ ঘটনায় সাইফুল সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে প্রকৃত সত্যতা এ রায়ে বেরিয়ে আসবে এটিই তাদের প্রত্যাশা।

নিহতের স্ত্রী সোনিয়া সেলাইয়ের কাজ করে ও আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় তাদের সংসার চালায়। এ ছাড়া হলি আটিজান কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে কিছু টাকা ও স্বজনদের অনুদান দিয়ে তাদের সন্তানদের পড়াশোনা চলে।

এ মামলার রায়ের অপেক্ষায় পরিবারটি দিন গুনছে। সাইফুল নিহত হওয়ার তিন মাস পর জন্ম নেয়া ছেলে হাসানের বয়স এখন ৩ বছর। সে এখন কথা বলতে শিখেছে। সাইফুলের তিন সন্তানের মধ্যে সামিয়া (১২) ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, ইলমী (৭) স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তিন সন্তানকে নিয়ে সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া আক্তারের এখন দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে।

গত সাড়ে তিন বছরেও কান্না থামেনি হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় নিহত রেস্তোরাঁর পিজার শেফ কর্মচারী নিহত সাইফুল পরিবারের।