logo-img

২৫, আগস্ট, ২০১৯, রোববার | | ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


সয়াবিন তেলে শূকরের চর্বি!

রিপোর্টার: নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৫ আগস্ট ২০১৯, ০৬:১৯ এএম


সয়াবিন তেলে শূকরের চর্বি!

মেশানো হচ্ছে ডেইরি ও পোল্ট্রি ফিডেও

খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশাতে মেশাতে আর কত নিচে নামবে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতদিন খাদ্যপণ্যে ট্যানারির বর্জ্য ও টেক্সটাইলের বিষাক্ত রঙসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মেশানোর খবর মিলেছে। সর্বশেষ পাস্তুরিত তরল দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতিও মিলেছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে এবার শূকরের চর্বি দিয়ে সয়াবিন তেল তৈরির খবর পাওয়া গেছে। সে সঙ্গে ডেইরি ও পোলট্রি ফিডেও মেশানো হচ্ছে শূকরের চর্বি। 

ঢাকার ধামরাই উপজেলার বাথুলি এলাকায় শনিবার রাতে ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির কারখানা কেবিসি অ্যাগ্রো লিমিটেডে র‌্যাবের এক অভিযান চালানোর পর এসব তথ্য জানা যায়। অভিযান পরিচালনা করেন র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। এ সময় তিনি ১১ কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার টন নিষিদ্ধ শূকরের মাংস, হাড় ও চর্বি জব্দ করেন। এ ছাড়াও পুরাতন ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাইস ব্র্যান অয়েল পুনঃবাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে নতুন ‘প্রাইস অ্যান্ড ডেট ট্যাগ’ লাগানোর মতো ঘৃণ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা ও কারখানা সিলগালা করা হয়।

ওই অভিযান সম্পর্কে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম সময়ের আলোকে বলেন, বিগত ৯ মাস ধরে বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ শূকরের চর্বি, মাংস ও হাড় (এমবিএম-মিট অ্যান্ড বোন মিল) মাহবুব গ্রæপের প্রতিষ্ঠান কেবিসি অ্যাগ্রো (প্রা.) লিমিটেড হংকং থেকে আমদানি করে আসছে। এ উপকরণ ব্যবহার করে মাছ ও মুরগির খাদ্য তৈরি করে নিয়মিত বাজারজাত করছে প্রতিষ্ঠানটি। তা ছাড়া যে কারখানায় এসব উপকরণ পাওয়া যায়, সেটি মূলত সয়াবিন ও রাইস ব্রান অয়েল তৈরির কারখানা। যেহেতু ভোজ্য তেল তৈরির কারখানায় এসব শূকরের চর্বি, মাংস ও হাড় রাখা হয়েছে, সেহেতু এসব উপকরণ ভোজ্য তেলে মেশানো হতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমরা কারখানাটি থেকে ভোজ্য তেলের স্যাম্পল নিয়ে এসেছি। পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে দিয়েছি। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। 

র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের সময় তার সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এমদাদুল হক ও ঢাকা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আলমগীর। আর অভিযানটি সমন্বয় করেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৪ এবং ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২-এর স্কোয়াড কমান্ডার সহকারী পুলিশ সুপার উনু মং।
এ সময় ওই কারখানার মহাব্যবস্থাপক তাপস দেবনাথ ও পরিচালক জাহিদুর রহমানের কাছ থেকে আমদানিকৃত আরও ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৪০ টন শূকরের চর্বি, মাংস ও হাড়ের চালান ফরম জব্দ করেন আদালত যা কুষ্টিয়া কেএনবি নামক প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা হয়। এ ছাড়াও বাজার থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ সয়াবিন তেল সংগ্রহ করে রিফাইন করে আবার বাজারজাতও করা হচ্ছিল কারখানাটি থেকে। 

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম অভিযানের বিষয়ে আরও বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা কারখানাটিতে অভিযান চালাই। সেখানে অভিযান চালিয়ে যেসব উপকরণ আমরা দেখেছি, তাতে আমরাও হতবাক হয়ে গেছি। ধারণাতেই ছিল না, নিষিদ্ধ শূকরের মাংস, চর্বি ও হাড় মিলবে এখানে। কারখানাটি দেশের একটি বড় শিল্প গ্রুপের, মাহবুব গ্রুপ। এ গ্রুপের বিশ্বাস পোলট্রি ফিড নামের আরেকটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ফিড শিল্পের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান এটি। 

এত বড় অপরাধের পরও কেন কারখানার মালিকের নামে কোনো মামলা দিলেন না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে কারখানাটিতে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। ৮০০ জনের মতো শ্রমিক কাজ করে। তাই অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত দিতে হয়েছে। তা ছাড়া মামলা দিয়েও খুব একটা লাভ হয় না। কারণ মামলা বা গ্রেফতার করলে বড় বড় উকিল ধরে সাত দিনের মধ্যে তারা জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে। এর আগে আমি বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম, কিন্তু তারাও এক সপ্তাহের মধ্যে জামিন নিয়ে বের হয়ে এসেছে। 

সারোয়ার আলম আরও বলেন, এসব অভিযান পরিচালনাকালে আমাদের নানা মহল থেকে হুমকি আসে, চাপ আসে। এর আগে একটি অভিযানের সময় ২৯ ব্যক্তি আমার কাছে তদবির করেছে। কিন্তু আমি কোনো ছাড় দিইনি। আমার কথা পরিষ্কার-যতই চাপ আসুক, আমার চাকরি গেলেও আমি এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেব না। আমাদের সন্তানের মুখে আমরা নিরাপদ খাদ্য তুলে দিতে চাই। তার জন্য আমাকে যত কঠোর হতে হয় হব।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, খাদ্যে ভেজালকারীদের অর্থলিপ্সা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। চরম অর্থলিপ্সা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই এখন খাদ্যে এত ভেজাল মেশানো হচ্ছে। তা ছাড়া সয়াবিন তেলে শূকরের চর্বি মিশিয়ে এসব অসাধু ব্যবসায়ী দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত হেনেছে। খাদ্যে ভেজাল এবং সরাসরি মানুষ হত্যা সমপর্যায়ের অপরাধ। তাই আইন সংশোধন করে খাদ্য ভেজালকারীদের মৃত্যুদন্ডের বিধান করতে হবে। যারা এ কাজ করছে তাদের ফাঁসি দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে হয়তো ভয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে আর ভেজাল মেশাবে না।