logo-img

২৭, মে, ২০১৯, সোমবার | | ২২ রমজান ১৪৪০


গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি গায়েব

রিপোর্টার: যুগান্তর | ০৫ মে ২০১৯, ০২:৪৭ পিএম


গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি গায়েব

হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির দুর্নীতির ফাইলের হদিস নেই

উচ্চ আদালতে করা একটি রিটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি মামলার ‘নথি’ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে সাবেক এক মন্ত্রী ও এমপিসহ অনেক হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির দুর্নীতির ফাইলও আছে। মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে কারসাজির মাধ্যমে ১০ ব্যবসায়ীকে লাইসেন্স প্রদান সংক্রান্ত রিটের কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে অন্য মামলার নথি হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সেকশন থেকে ফাইল গায়েবের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আদালতের নজরে আনা হয়েছে। তবে এখনও এগুলোর সন্ধান না মেলায় মামলার কূলকিনারা করতে পারছে না দুদক। এছাড়া মালয়েশিয়ায় লোক প্রেরণ সংক্রান্ত রিটে দুদককে পক্ষভুক্ত করায় সংস্থাটি নথির অভাবে মামলার দায় থেকে নিষ্কৃতি চেয়ে এফিডেভিটও করতে পারছে না।

এ প্রসঙ্গে দুদকের আইন শাখার মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আদালতের সেকশন থেকে এভাবে আরও অসংখ্য মামলার নথি গায়েব করা হয়েছে। দুদকের বেশকিছু মামলার নথিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দুদকের প্রধান কৌঁসলি খুরশিদ আলম খান যুগান্তরকে বলেন, সাবেক এক মন্ত্রীর দুর্নীতি মামলার ফাইল দীর্ঘদিন ধরেই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রীর নাম প্রকাশ না করে দুদক কর্মকর্তা বলেন, আমরা সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর অভিযোগ করি। তাতেও না পাওয়ায় নথি পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করি। এরপর তা পুনর্গঠন করা হয়। এসব করতেও এক বছরের বেশি সময় চলে যায়। এছাড়া এক এমপির দুর্নীতির নথিও গায়েব।

দুদকের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বলেন, এ মামলার ফাইল হাইকোর্টের শাখায় নেই। খুঁজে বের করতে আমরা লোক লাগিয়েছি। আদালতের কাছেও আবেদন করে ‘মেনশন’ করেছি। কুতুবুর রহমান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলার নথিও পাওয়া যাচ্ছে না। ফৌজদারি আপিল নং-৩৭৩৩/২০০৮, রিট মামলা নং-৭১৩২/২০০২ ও ৫১৮২০/২০১৮নং মামলার নথি গায়েব করে দেয়া হয়েছে। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাদের মধ্য থেকে কোনো একটি চক্র এভাবে একের পর এক আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করছে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক আবদুল আলিমসহ ১০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করে প্রতিকার চান। (মামলা নং-১৩২৮৭/২০১৮)। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই বছর ২৯ অক্টোবর প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দুদক, আইজিপি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিযোগিতা কমিশন, ব্যুরো অব ম্যান পাওয়ার ও বায়রাসহ ৯টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০টি সুবিধাভোগী রিক্রুটিং এজেন্সিকে শোকজ করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন।

দুদকসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ আদেশে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া ব্যবসা ঠেকাতে কেন ব্যর্থ হয়েছে তার জন্য কারণ দর্শাতে হবে। রিট মামলায় আবেদনকারী আবদুল আলিম ছাড়া অপর যেসব ব্যবসায়ী উচ্চ আদালতে এ মামলায় পক্ষ হয়েছেন তারা হলেন- আকবার হোসেন মঞ্জু, তরিকুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন ভুইয়া, টিপু সুলতান, আরিফুর রহমান, মো. মহিউদ্দিন, আক্তার হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও আহসান হাবিব। এরা সবাই বিদেশে জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তারা সরকারি ৯টি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও গোলাম মোস্তফা, রুহুল আমিন, মোহাম্মদ বাসির, তুহিন সিদ্দিকীসহ ১০ জন ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিষ্ঠানকে বিবাদী করেন।

সূত্র জানায়, আদালতের ওই রিট মামলার পর বাংলাদেশে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করা প্রতিযোগিতা আইন ও কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মূলত তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে- দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করে তা বজায় রাখা। বাজারে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি (এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ) এবং ওলিগোপলি (সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ রাখা) অবস্থা জোটবদ্ধ কিংবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা এবং এমন কিছু হলে তা নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করা। কিন্তু প্রতিযোগিতা কমিশন ৬ বছরে সে ধরনের দৃশ্যমান কোনো কাজ করতে পারেনি। তাদের ব্যর্থতার কারণেই বলা চলে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের প্রতিনিধিরা আদালতের দ্বারস্থ হন। রিট মামলা করে প্রতিকার চেয়েছেন তারা। সেই প্রেক্ষিতে আদালত শোকজ করেন।

দুদকের আইন শাখার মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা দুদক আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধ নিয়ে কাজ করি। কারসাজি করে ব্যবসায়ীরা বাজার বা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে নিজেরা লাভবান হলে সেখানে দুদকের কিছু করার থাকে না। এটা দেখার কথা প্রতিযোগিতা কমিশনের। তারাই এ বিষয়ে জবাব দিতে পারবে কেন ব্যর্থ হয়েছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায়। তবে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক সময় দুর্নীতি হতে পারে। দুদক দেখবে সেই দুর্নীতি-অনিয়ম।

এই বাস্তবতায় আমরা আদালতের কাছে আমাদের বক্তব্য দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিই। আমরা রিটের আওতা থেকে আমাদের নাম কর্তন করতে আবেদন করি। আমাদের আইনজীবী দুদকের পক্ষে আবেদনের বিষয়টি আদালতেও ‘মেনশন’ করেছেন। কিন্তু শুনানি করতে গিয়ে জানতে পারি, ওই রিট মামলার নথির হদিস নেই। যে নথির মাধ্যমে আদালত আদেশ জারি করেছেন- সেই নথি গায়েব।

দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আরও বলেন, ব্যবসায় প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত রিট মামলার নথি কারা গায়েব করছে সেটাও বলতে পারছি না। তবে খোঁজখবর নিচ্ছি। নথির অভাবে শুনানি শেষ করতে পারছি না। মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর বিষয়ে করা রিট মামলায় দুদকের পক্ষ থেকে এফিডেভিটও করতে পারিনি। কারণ নথি থেকে আমাদের নোট নিতে হয়। নথির সর্বশেষ অবস্থা কি জানার চেষ্টা করছি।

এদিকে দুদকের মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম জানান, উচ্চ আদালতের মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোয় একচেটিয়া ব্যবসা সংক্রান্ত রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের ওই শোকজ আদেশের পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠনের জন্য দুদকের কাছে প্রতিনিধি চায়। চিঠি দিয়ে তারা দুদকে কর্মরত যুগ্মসচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করতে বলে।

তবে দুদক থেকে পাল্টা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, দুদক নিজেই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে তদন্ত বা এ সংক্রান্ত কমিটির সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন নেই। ওই মন্ত্রণালয় কি করবে তারা নিজেরাই ঠিক করবে এবং আদালতের কাছে তাদের বক্তব্য তারা উপস্থাপন করবে। তিনি আরও বলেন, দুদক যদি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোনো কমিটির হয়ে কাজ করে তাহলে সেটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হয়ে যাবে। সে কারণে মন্ত্রণালয়ে আমাদের প্রতিনিধি দিতে আপত্তি রয়েছে।

এদিকে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন হওয়ার পরও কেন এই কমিশন কাজ করতে পারছে না সে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১২ সালে করা এই কমিশনের জন্য কয়েক ধাপে বিধি করা হলেও লোকবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখনও আঁতুড়ঘরেই রয়ে গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের সদ্য বিদায়ী (২৪ এপ্রিল) চেয়ারপারসন মো. ইকবাল খান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, লোকবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি ‘অসামর্থ্য’ হয়ে আছে। কয়েক ধাপে বিধি হলেও কাজ করার মতো লোক এই প্রতিষ্ঠানে নেই। বিধি অনুযায়ী ৭৩ জন লোক দরকার কমিশনের জন্য। কিন্তু কোনো লোকবল নেই। এ কারণে কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, লোকবল নিয়োগ হলেও বছরে ৪-৫টির বেশি মামলা করা যাবে না। আমি তিন বছরে মাত্র ২টা ফাইল ইনকোয়ারি করতে পেরেছি। আর ২টি ইনকোয়ারি চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোয় রিট মামলার বিষয়টি জানি। হাইকোর্ট ওই দশ ব্যবসায়ীর করা আবেদনের বিষয়ে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলেছেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘লিড’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তদন্ত করছে বলে শুনেছি। সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আবদুল্লাহকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত