logo-img

১৭, জুন, ২০১৯, সোমবার | | ১৩ শাওয়াল ১৪৪০


‘কেউ দেহ বেইচা পরিবার পালে, আবার কেউ শরীরের ক্ষুদা মিডায়’

রিপোর্টার: নিউজ ডেস্ক | ১৫ জানুয়ারী ২০১৯, ০১:৩৬ পিএম


‘কেউ দেহ বেইচা পরিবার পালে, আবার কেউ শরীরের ক্ষুদা মিডায়’

দেহ ব্যবসা। আদিম রিপু। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে চলে আসছে এ পেশা। পৃথিবী যতদিন থাকবে এ পেশাও ততদিন চলবে। এই পেশা পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশাগুলির অন্যতম। অনেকের মতে, দেহ ব্যবসাই প্রাচীনতম। তবুও এই পেশার মানুষ সমাজের সবচেয়ে উপেক্ষিত। দেহ ব্যবসা; শুনলেই কানে আঙুল দেয় তথাকথিত ‘অভিজাতরা’। এরপরও কিন্তু থেমে নেই এই ব্যবসা।

পৃথিবীতে শরীর বেঁচা অন্যায় নয়। যদি হতো তাহলে বহু বছর ধরে চলে আসা এ রীতি আজ অবধি থাকত না। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার অবধি এই পেশা টিকে থাকবে বলার অপেক্ষা রাখে না। যৌন সম্পর্কের জন্য শরীর বিক্রি অন্যায় নয়, শরীর কেনা অন্যায়। সকলেই তার চাহিদার জন্য বহু কিছু করে। সব ন্যায়-অন্যায়ের নিক্তি কি পরিমাপ করা যায়?

অনেকেরই ধারণা বাংলাদেশের মতো তথাকথিত রক্ষণশীল দেশে দেহ ব্যবসা! ‘তওবা তওবা’ বলে কানে আঙুল দেওয়ার মতো একটা বিষয়! কিন্তু অবাক করা তথ্যটি হল, বাংলাদেশে দেহ ব্যবসা আইনত স্বীকৃত! এবং দেহ ব্যবসা ঘিরে দেশটিতে দুর্নীতিও আকাশছোঁয়া! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। এটাই সত্যি।

কিছু কাজ আছে যা আমরা ইচ্ছের বিরুদ্ধে করি। মনের উপর যেমন কারও হাত নেই। তেমনি শরীরের উপরও নিয়ন্ত্রণ সব সময় থাকে না। কেন নারীরা শরীরের ব্যবসায় নেমে আজ অবধি টিকে আছে। কিছু লোক দিব্যি এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে জীবন পরিচালনা করছে। তাদের একজন মধু মিয়া। বয়স ৪৫ বছর। বাড়ি নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায়।

মধু মিয়ার কাজ মেয়েদের (যৌনকর্মী) খদ্দের জোগার করে দেয়া। মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে সৈনিক ক্লাব পর্যন্ত বেশ কিছু আবাসিক হোটেলই তার কর্মস্থল। প্রতিদিন গড়ে তার আয় ১৫০০ টাকা। প্রায় পনের বছর যাবৎ এই পেশায় জড়িত তিনি।

কিভাবে নামলেন এই পেশায়? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছোট বেলায় বাড়ি ছেড়েছে। আর দশ জনের গল্পের মত সৎ মায়ের অত্যাচারে। ঢাকায় সে বহু কাজ করে শেষ পর্যন্ত মেয়েদের দালালিতে এসেছে। তার কাছে সমাজে কোন পেশাই ছোট না, সব পেশা মানুষের প্রয়োজনেই তৈরি হয়েছে।

তার ভাষায়, ‘আনহে পড়া লেহা করছেন। আর আমি করি নাই। কেমনে করমু কন? ছোট বেলাই মা গেছে মইরা, বাবাই আবার নতুন সংসার পাতছে। আমার নতুন মা সংসারে আসতে না আসতেই আমারে খাওয়া দাওয়া ঠিক মতন দেয় না, কথাই কথাই শুধু মারে। শেষে বাড়ি ছাড়লাম। আর বাড়ি যাই নাই। এভাবেই শুরু ঢাহার জীবন। আমার নতুন পেশা, মেয়েদের দালালি। আমি অখুশি না। কারণ কোন পেশাই আমার কাছে ছোট না। সব কাজের জন্য লোক দরকার বুজছেন সামবাদিক ভাই। আমরা যদি মেয়েদের দালালি না করি তবে আনহেগোর মত ভদ্দন লোকরা কী কইরা শরীরের ক্ষুদা মিডাইবেন, কনতো দেহি? এমনি এমনি দুনিয়াতে কিছু আসে নাই। কেউ শরীর বেইচা পরিবার পালে, আবার কেউ শরীরের ক্ষুদা মিডায়। সব কিছুর দরকার আছে। নাইলে মানুষগুলা কেমন কইরা শরীরের জ্বালা মিডাইতো কন আনহে!’

প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় সরাসরি আসি নাই। একদিন নারায়নগঞ্জ থেকে ট্রেনে উঠি, তারপর বিভিন্ন জেলায় ঘোরাফেরা করতে শুরু করি। কিন্তু কোন কাজেই মন বসে না। বহু কষ্টের কাজ আমি করেছি। শেষ অবধি এই নারীর দালালি কাজে যোগ দিয়েছি। একদিন এক বড় ভাই এই লাইনে দাদাও বলে আবর বসও বলে। তবে আমি দাদাই বলতাম। তার সাথে চলাফেরা শুরু করি। এভাবেই এই লাইনে।

নিজের জীবনের সব থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে সব থেকে বড় কষ্টের কথা, যে দাদার সাথে চলছি সে একদিন আমাকে যৌন নির্যাতন করে। যৌন নির্যাতন করে সে আমাকে বলে, ছেলেদের করতে এমন লাগে তো মেয়েদের করতে কেমন লাগবে বল? বিরাট মজা না? সেদিন আমার খুব কষ্ট হইল ভাই। সেই দিনের কথা আজও ভুলি নাই। মনে কইরা লাভ কী কন? আমি যেখানে ইজ্জত হারাইছি আর কারও ইজ্জত রক্ষা করতে দিমু না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি দাদার সাথে একদিন হোটেলে যাই নিজে কাম (দেহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শুতে) করতে। তখন মাথায় ভূত চাপল টাকা ছাড়া এই কাম কেমনে করা যায়। এই লাইনে বহু মানুষ কাজ করছে। আমিও তো করতে পারি। সমস্যা কোথায়? একটু চেষ্টা করলে আমিও পারব। পেশা খারাপ না। প্রতিদিন মন চাইলে করতে পারমু। তখন ওটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখন পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছি। খারাপ লাগে না। আমার কাছে ভালই লাগে।’

দেহ ব্যবসা জড়িত মেয়েদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বেচ্ছায় এই পেশায় খুব কম মেয়েই আসে। আমার দেখা বহু মেয়ে আছে যারা প্রতারণার শিকার হয়েই এই বেশ্যায় নাম লেখায়।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিন হোটেলে এক মেয়ের কাছে যাই। তখন জানতে পারি তাকে তার বন্ধু এই পেশায় নামিয়েছে। মেয়েটার নাম ছিল স্বপ্না, বাড়ি ছিল জামালপুর। গার্মেন্টেসে কাজ করতো সে। তার বন্ধু তাকে হোটেলে নিয়া আসত বিয়ার কথা বইলা। শেষে মেয়েটারে আর বিয়া করে নাই। তখন আমি বললাম আপনি যদি নিয়মিত কাজ করতে চান তবে খদ্দের জোগার করে দিতে পারব। আমার এক দাদা আছে যার বড় বড় লাইন আছে। যদি আপনি প্রয়োজন মনে করেন? তারপর থেকে আমিও এই লাইনে জড়াইয়া গেলাম।’

মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে সৈনিক ক্লাব পর্যন্ত বেশ কিছু আবাসিক হোটেলে এই কাজ হয়ে থাকে বলে মধু মিয়ার ভাষ্য। এখানে তার মত ১২-১৫ জন মানুষ এই দালালির কাজ করে। সমাজের সব শ্রেণী পেশার মানুষ এখানে আসে দাবি মধু মিয়ার।

তার জোগার করা মেয়ে মান সম্মত বলে তিনি জানান। রেট খুব বেশি না বলে তিনি মনে করেন। কেমন রেট কি ভাবে, একটু বলবেন, জি প্রতিবার, ৬০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত রেট আছে। তবে মেয়ে বুঝে এসব রেট নির্ধরণ হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উঠতি মডেল যুবতীরা এখানে আসে দাবি মধু মিয়ার।