logo-img

২০, অক্টোবর, ২০১৯, রোববার | | ২০ সফর ১৪৪১


'২০২১ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ, ২৪'শে কমপক্ষে উন্নত দেশ'

রিপোর্টার: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:২০ পিএম


'২০২১ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ, ২৪'শে কমপক্ষে উন্নত দেশ'

নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সাক্ষাৎকার। ছবি : নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাপানি সংবাদমাধ্যম 'নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ'র কাছে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বুধবার (৫ ডিসেম্বর) বলেন, 'বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি আগামী ৩ বছরের মধ্যে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি  ১০ শতাংশে পৌঁছবে। আমার দেশটি ২০২৪ সালের মধ্যে 'কমপক্ষে উন্নত দেশ' পদমর্যাদায় উন্নীত হবে।'

হাসিনার শাসনাধীন দেশটি গত এক দশকে একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে উত্তীর্ণ হয়। শেষ অর্থনৈতিক বছরের জুন পর্যন্ত দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। চলতি অর্থনৈতিক বছরের শেষ নাগাদ দেশটিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২৫ ধরা হয়েছে বলে তিনি জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, 'যদি আমি নির্বাচনে জয়লাভ করি তাহলে ২০২১ সালের মধ্যেই আমার দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে যাব। এই উদ্দেশ্য নিয়েই আমি আপনাকে এই প্রোগ্রামের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিচ্ছি। কিছু নীতিমালার মাধ্যমেই এশিয়ার সবচেয়ে গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করবে আমার দেশ।'

একটি উদাহরণ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, 'বাংলাদেশ বিদেশি কোম্পানিদের তুষ্ট করতে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১১ টি অঞ্চলের কাজ চলছে এবং নির্মাণাধীন রয়েছে আরও ৭৯ টি।'

বাংলাদেশে আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন হাসিনার গৃহীত নীতিমালার জন্যে একটি কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। গত নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের নির্বাচনে হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছিল, যে নির্বাচনটি দেশটির বৃহত্তম বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কর্তৃক প্রত্যাখাত হয়েছিল। 

আগামি নির্বাচনে বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিলেও দলটির প্রধান বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাবাসে রয়েছেন। যদিও জনমত জরিপ বলছে, হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩০০ সংসদীয় আসনের নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করতে পারে।

শেখ হাসিনা বলেন, আগামী বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ তার ২য় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রজেক্ট শুরু করবে। দেশব্যাপী অর্থনৈতিক তেজস্বিতার অংশ হিসেবে ঢাকার উদ্যোগে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসারিত করতেই এই বৈচিত্র্যময় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মতে, বাংলাদেশের ১৭ হাজার ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতার ৫৮ শতাংশই আসে প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। কিন্তু দেশে গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বাড়ানো হচ্ছে এবং এর পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি এবং পুনর্বিকরণযোগ্য শক্তি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় চাহিদা মেটায়, যা বার্ষিক আনুমানিক ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০০৯ এর শুরুর দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই হাসিনা একটি উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করেছেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্তও দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ২৭ থেকে ১২১ করেছেন, ১৬ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ৪৭ শতাংশ থেকে ৯১ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 

দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা রূপপুরে রাশিয়া ও ভারতের সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। হাসিনা বলেন,'এই সুবিধাটি দুটি চুল্লীর আউটপুটে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন যা ২০১৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে। দ্বিতীয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এখনও জমি সন্ধান করছি। আমি আশা করি যে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্রপীড়িত এলাকা দক্ষিণাঞ্চলে নির্মাণের আশা রয়েছে।'

বেইজিংয়ের আনুমানিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের মধ্যে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য দ্বিপাক্ষিক সহায়তা ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এবং যৌথ উদ্যোগে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে চীন সম্প্রতি তার ভারতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে উৎখাত করে ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা অর্জন করেছে।চীনা সামরিক হার্ডওয়্যারের শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারকদের মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

সব শক্তিশালী দেশের সঙ্গে তার দেশের 'সু-সম্পর্ক' প্রতিষ্ঠিত রয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত এবং আরামদায়ক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবটি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা শুধু রয়েছে ঢাকারই।

২০১৬ সালের শেষের দিকে জীবন বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি একটি নির্বাচনী ইস্যুতে রূপ নিতে পারে বলে তিনি তখন উদ্বিগ্ন ছিলেন।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের অভিজ্ঞতার পর রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশীরা একাত্মতা অনুভব করেছিল, যখন আনুমানিক ১ কোটি বাংলাদেশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমারা ধারণা করেছিল মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ থেকে ২০ লাখ ছিল।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, 'আমি অতি সৌভাগ্যবতী যে, জনগণ আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, আমি আমার লোকেদের তাদের (রোহিঙ্গাদের) দুঃখ অনুভব করতে আহ্বান জানালাম। প্রয়োজন হলে, আমরা আমাদের খাবার ভাগ করে নেব। আমাদের লোকেরা এটা মেনে নিয়েছিল এবং তা পালনও করেছিল। আমরা আমাদের অংশ সম্পন্ন করেছি। আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি, আমরা তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং শিশুদের যত্ন নিচ্ছি এবং নারীদের যত্ন নিচ্ছি।'

নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে উভয় দেশ শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে সম্মত হয়েছিল তবে ফেরত পাঠানোর তালিকায় থাকা প্রথম দল বাংলাদেশ ছাড়তে অস্বীকার করার পর এই প্রচেষ্টা স্থগিত করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী একটি দ্বীপে নানা সুযোগ সুবিধাসহ কিছু শরণার্থীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা হাসিনা নিশ্চিত করেছেন। যদিও আন্তর্জাতিক মহল এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছে যে, এই দুর্যোগপ্রবণ দ্বীপটি একটি বন্দীশিবির হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি দ্বীপ, এটি মানুষের দ্বারা গবাদি পশু চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়। তারা সেখানে আরও ভালভাবে বসবাস করতে পারবে। শিশুদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকবে। আমরা একটি গুদাম তৈরি করেছি যাতে আমরা সেখানে ত্রাণ সরবরাহ করতে পারি। এই মুহুর্তে আমরা ১ লক্ষ মানুষের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু আমরা সেখানে ১০ লাখ মানুষকেই নিতে পারব।'

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে পুনরাবৃত্তি করেন যে, কোনও উদ্বাস্তুকে মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার জন্য বাধ্য করা হবে না তবে সমস্যা সমাধানে সহায়তা করার জন্য অন্যান্য দেশ ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে ডাকা হবে।

তিনি আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে খুঁজে বের করতে হবে কীভাবে মিয়ানমার তাদের জনগণকে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিবে।'